ব্রাউজার এর উৎপত্তি ও কিভাবে আয় করে

ব্রাউজার ইন্টারনেট ওয়েব ব্রাউজিং এর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এপ্লিকেশন। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৪.৬৬ বিলিয়ন অ্যাক্টিভ ইন্টারনেট ইউজার পাশাপাশি 4.32 বিলিয়ন অ্যাক্টিভ মোবাইল ইন্টারনেট ইউজার রয়েছে।এত এত ইন্টারনেট ইউজারদের কাছে গুগল ক্রোম, মাইক্রোসফট এজ, সাফারি, ফায়ারফক্স ও অপেরার মতো ব্রাউজার গুলো সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়।

তবে ওভারঅল মার্কেট শেয়ার এর দিক থেকে ৬৪.৪৭% মার্কেট শেয়ার এর পাশাপাশি মোবাইল সেগমেন্টে ৬৩.১৭% এবং কম্পিউটার সেগমেন্টে ৬৭.৫৩% নিয়ে গুগল ক্রোম বিশ্বের লিডিং ব্রাউজার। এছাড়া ১৮.৬৯% ওভার অল মার্কেট শেয়ার নিয়ে অ্যাপলের সাফারি দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। 

ব্রাউজার তৈরির ইতিহাস

ব্রাউজার ইতিহাস নিয়ে বলতে গেলে শুরুতে চলে আসে World-Wide-Web প্রতিষ্ঠাতা ব্রিটিশ সাইন্টিস্ট Tim berners lee এর কথা। ১৯৯১ সালে একই নামে বিশ্বের প্রথম ওয়েব ব্রাউজার তৈরি করেন তিনি। যা দিয়ে ব্রাউজিং এর পাশাপাশি ওয়েব পেজ এডিট করা যেত।

পরবর্তীতে কনফিউশনে এড়াতে নাম পরিবর্তন করে নেক্সাস রাখা হয়। তবে ব্রাউজারটিতে ওয়েব পেইজ ব্রাউজ করা গেলেও কোন ইমেজ দেখা যেত না।

১৯৯৩ সালে Marc Andreessen ইউনিভার্সিটি অফ ইলিনৈস এর ন্যাশনাল সেন্টার ফর সুপার কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন (NCSA) এর সহযোগিতায় মোজাইক নামের একটি ব্রাউজার ডেভেলপ করেন। যা ছিল বিশ্বের প্রথম যেটাতে টেক্সট এর পাশাপাশি ইমেজ দেখা যেত।

ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব

১৯৯৪ সালে Marc Andreessen NCSA ছেড়ে দিয়ে নেটস্কেপ কমিউনিকেশনস নামে নতুন একটি কোম্পানির প্রতিষ্ঠা করেন। সে বছরই মোজাইকের উপর ভিত্তি করে নির্মিত তৎকালীন জনপ্রিয় ব্রাউজার নেটস্কেপ নেভিগেটর (Netscape Navigator) বাজারে আসে।

মোজাইক ও নেটস্কেপ এর মার্কেট শেয়ার

ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্ট এর একটি তথ্য সূত্রে ১৯৯৫ সালে ব্রাউজার টি ৯০ শতাংশ মার্কেট শেয়ার দখল করে নিতে সক্ষম হয়েছিল। ইনিশিয়ালি নন-কমার্শিয়াল ইউজারদের জন্য ফ্রিতে ব্যবহারের সুযোগ থাকার কথা জানালেও ৬ মার্চ ১৯৯৫ থেকে শুধুমাত্র নন-প্রফিট অর্গানাইজেশন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ব্যতীত বাকি সকল ইউজারদের থেকে ব্রাউজারটি চার্জ করতে থাকে।

এদিকে 1994 সালে স্পাই গ্লাস ইনকর্পোরেশন মোজাইকের সোর্স কোড লাইসেন্সিং এর মাধ্যমে স্পাই গ্লাস এনহান্সড মোজাইক আরেকটি ব্রাউজারে ডেভেলপ করে। তবে এটি এন্ড ইউজারদের জন্য রিলিজ না করে বিভিন্ন কোম্পানির কাছে বিক্রি করা হয়।

ইন্টারনেট এক্সপ্লোরারের উৎপত্তি

১৯৯৫ সালে মাইক্রোসফট ৮ মিলিয়ন ডলারে স্পাই গ্লাস এনহ্যান্সড মোজাইক ব্রাউজারটির লাইসেন্সিং এর মাধ্যমে ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার ডেভেলপ করে। ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার মাইক্রোসফট উইন্ডোজ ৯৫ প্লাস ভার্সন থেকে শুরু করে পরবর্তী সকল উইন্ডোজে ফ্রিতে শিফট করা হত।

এছাড়াও অ্যাপলের সাথে একটি ডিলের কারণে ম্যাকিন্টশ ডিভাইসের ডিফল্ট ব্রাউজার হিসেবে ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার শিফট করা হত। ফ্রিতে শিফট করার ফলে ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার এর সকল ভার্সন ১৯৯৯ সালের মধ্যে ৭৫ শতাংশের বেশি মার্কেট শেয়ার নিতে সক্ষম হয়।

এদিকে ইন্টারনেট এক্সপ্লোরারের সামনে ক্রমাগত মার্কেট শেয়ার হারাতে থাকা ১৯৯৮ সালে নেটস্কেপ নেভিগেটরকে ওপেন সোর্স করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি ২০০৩ সালে মাইক্রোসফট ও অ্যাপলের ডিলটি শেষ হয়ে গেলে অ্যাপল তাদের ম্যাকিন্টশ পার্সোনাল কম্পিউটারের জন্য ডিফল্ট ব্রাউজার সাফারি চালু করে। যা বর্তমানে আইফোন এবং আইপ্যাডেও ব্যবহার করা হয়।

মজিলা ফায়ারফক্স তৈরি

২০০৪ সালে এওএল (AOL) নেটস্কেপ কে কিনে নিলে এর ওপেন সোর্স সফটওয়্যার দিয়ে মজিলা প্রজেক্ট তৈরি করা হয়। যার প্রেক্ষিতে  ২০০৪ সালে নভেম্বর মাসে মজিলা ফায়ারফক্স চালু করা হয়। সে সময় ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার মার্কেট শেয়ারের দিক থেকে ৯৪ শতাংশ বেশি মার্কেট শেয়ার অর্জন করে নিতে সক্ষম হয়েছিল।

১৯৯৬ সালে রিলিজ হওয়া অপেরা ২০০৫ সালে ফ্রি করে দেওয়া হয়। এই ব্রাউজার গুলো মূলত ইম্প্রুভ সিকিউরিটি ও স্পিড দেয়ার মাধ্যমে মার্কেটে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।

২০০৮ সালে গুগল আইসোলেটেড ট্যাব এবং ফাস্ট ব্রাউজিং ফিচার সহ তাদের নিজস্ব ওয়েব ব্রাউজার গুগল ক্রম চালু করে। এটি গুগলের ক্রমিয়াম ওপেন সোর্স কোড বেইজের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল।

ক্রমের সবচেয়ে উল্লেখ যোগ্য ফিচার ছিল কোনো একটি ট্যাব ক্রাশ করলেও অন্যান্য ট্যাবগুলো ঠিকই কাজ করত।

গুগল ক্রোমের জনপ্রিয়তা

২০১৩ সাল নাগাদ ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার এবং ফায়ারফক্স কে পেছনে ফেলে গুগল ক্রম বিশ্বের সবচাইতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সে বছর গুগল ক্রোম ৩৪.৭ শতাংশ মার্কেট শেয়ার নিয়ে লিডিং পজিশনে ছিল যার বিপরীতে ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার এবং ফায়ারফক্স এর মার্কেট শেয়ার ছিল যথাক্রমে ২৩.৭৪ ও ১০.৯১ শতাংশ।

ক্রোম মার্কেট শেয়ার

২০১৫ সালে মাইক্রোসফট তাদের নিজস্ব এইচটিএমএল (html) ইঞ্জিন বেইজড ওয়েব ব্রাউজার মাইক্রোসফট এজ রিলিজ করে। ইভেনচুয়ালি ২০১৯ সালে মাইক্রোসফট গুগলের ওপেন সোর্স প্রজেক্ট  ক্রমিয়াম ইঞ্জিনের উপর ভিত্তি করে মাইক্রোসফট এজ বিল্ড করে এবং ধীরে ধীরে ইন্টারনেট এক্সপ্লোরারকে রিপ্লেস এর কাজ শুরু করে। কিছু টিপস এন্ড ট্রিক্স এটিকে সহজতর করতে সাহায্য করে।

২০২১ সালের মে মাসে মাইক্রোসফট অফিসিয়ালি ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার সাপোর্ট বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দেয়। স্ট্যাট কাউন্টারের তথ্য সূত্রে বর্তমানে গুগল ক্রোমের গ্লোবাল মার্কেট শেয়ারের পরিমাণ ৬৪.৪৭%। অন্যদিকে সাফারি, ফায়ারফক্স এবং এজের মার্কেট শেয়ার যথাক্রমে ১৮.৬৯%, ৩.৫৯%, ৩.৩৯%।

ক্রোমের মার্কেট শেয়ার

মোবাইল ব্রাউজারের দিক থেকে ৬৩.১৭% মার্কেট শেয়ার গুগল ক্রোম শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে ২৪.৪৩% ও ৬.০৪% মার্কেট শেয়ার নিয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে সাফারি ও স্যামসাং ইন্টারনেট।

ক্রমের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় গুগলের ওপেন সোর্স প্রজেক্ট ক্রোমিয়াম অপারেটর সিস্টেমের উপর বেইজড করে ক্রোম ওএস (Chrome OS) ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা লাভ করছে।

আইডিসির একটা রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২০ সালে বিক্রিত ডিভাইস গুলোর মধ্যে ক্রোম ওএস চালিত ডিভাইস ম্যাক ওএস কে ছাড়িয়ে গিয়েছে।

সেই বছর মোট বিক্রিত ডিভাইসের মধ্যে ক্রোম ওএস চালিত ডিভাইসের মার্কেট শেয়ার ছিল ১০.৮%।

ক্রোম ওএস মূলত একটি ওয়েব ভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেম এবং বেসিক্যালি গুগল ক্রম ওয়েব ডিস্ট্রিবিউশন ও মার্কেটিং আরো জোরদার করেছে।

ইন্টারনেটের শুরুর দিকে ব্রাউজার গুলো ব্যবহার করতে হলে অন্যান্য এপ্লিকেশন এর মত কিনে নিতে হত। অথচ বর্তমানে বিশ্বে এত এত থাকলেও সবগুলো ফ্রিতে ব্যবহার করা যাচ্ছে। কিন্তু ফ্রিতে ব্যবহার করা যায় এমন একটি এপ্লিকেশন থেকে কোম্পানি গুলো কিভাবে আয় করে?

ব্রাউজার কিভাবে আয় করে

ব্রাউজারের রেভিনিউ জেনারেটের একটি মেজর সোর্স হলো রয়্যালটি। মূলত ডিফল্ট  সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে সার্চ ইঞ্জিন কোম্পানি গুলোর সাথে চুক্তি করা হয় যা রয়্যালটি চুক্তি হিসেবে পরিচত হয়।

ইনভেস্টোপিডিয়ার একটি তথ্য সূত্রে ২০১৮ সালে মজিলা ফায়ারফক্স ৪৫১ মিলিয়ন রেভিনিউ জেনারেট করতে সক্ষম হয় যার ৯৫% আসে রয়্যালটি থেকে।

এছাড়া ২০১৯ সালে ফরচুনের একটা রিপোর্ট অনুযায়ী সাফারিতে গুগলকে ডিফল্ট সার্চ ইঞ্জিন করতে ১২ বিলিয়ন ডলার পে করা হয়।

চায়নার বায়ডু ও রাশিয়ার ইয়ান্ডেক্স ব্রাউজার গুলোকে ডিফল্ট সার্চ ইঞ্জিন করতে পে করে থাকে।

রয়্যালটি পাশাপাশি আরেকটি সোর্স হচ্ছে এড রেভিনিউ। যেমন ব্রেভ ব্রাউজারের ব্যাসিক এটেনশন টোকেন রিওয়ার্ড প্রোগ্রাম।

অপেরা এড

এই প্রোগ্রামের আওতায় ব্রেভ ইউজারের এড দেখার বিনিময়ে যে রেভিনিউ জেনারেট করে তার ৭০ শতাংশ ইউজারদের সাথে শেয়ার করে এবং বাকি ৩০ শতাংশ নিজের রেখে দেয়।

ব্রাউজারগুলো ইউজারের আইডেন্টিটি, হিস্ট্রি, লোকেশন ডাটা সহ আরো বিভিন্ন বিহেভিয়ার অল ডাটা কালেক্ট করে এবং তা স্টল করে রাখে। যার বিনিময়ে বিভিন্ন কোম্পানি গুলো পে করে থাকে।

এসব তথ্যের মাধ্যমে সার্চ ইঞ্জিন ও এড প্লাটফর্ম গুলো ইউজারদের পার্সোনালাইজড এড শো করতে পারে। এসব তথ্য বিক্রি করে ব্রাউজার গুলোর সার্চ ইঞ্জিন এবং এড প্লাটফর্ম থেকে আয় করে।

মর্ডান ব্রাউজার গুলোর বেশির ভাগই এক্সটেনশনের মাধ্যমে ইউজারদের এক্সট্রা ফিচার দেয়ার সুবিধা দিয়ে থাকে। এসব এক্সটেনশন গুলো মূলত থার্ড পার্টি ডেভেলপারের মাধ্যমে ডেভেলপ করে থাকে এবং ব্রাউজার গুলোর নিজস্ব মার্কেটপ্লেসে পাবলিশ করে থাকে।

এদের মধ্যে যেসব এক্সটেনশন গুলো ইউজারদের চার্জ করে থাকে ব্রাউজার গুলোর সেসব এক্সটেনশন থেকে ইউজারদের চার্জ করার প্রেক্ষিতে ফি চার্জ করে থাকে।

ব্রাউজার গুলোর হোমপেজে বিভিন্ন কোম্পানির ওয়েবসাইট বুকমার্ক করার মাধ্যমেও রেভিনিউ জেনারেট করে থাকে।

যেমন অপেরা ব্রাউজারের হোমপেজে বুকিং ডট কম (Booking) ও ইবেয় (Ebay) এর মত বেশ কিছু কোম্পানির ওয়েবসাইট লিংক বুকমার্ক করা থাকে। যার বিনিময়ে কোম্পানি অপেরা কে পে করে।

অপেরার পাশাপাশি ফায়ারফক্স ও এজের মত ব্রাউজার গুলোও একই ভাবে লাইসেন্সিং এর মাধ্যেমে কোম্পানি ও সার্ভিসগুলো থেকে আয় করে থাকে।

ফায়ারফক্স ইউজার থেকে ডোনেশন ও নিয়ে থাকে। যদিও ডোনেশন থেকে খুব অল্প পরিমাণ আসে তবে ম্যাক্সিমাম রেভিনিউ আসে রয়্যালটি থেকে।

উপসংহার

ব্রাউজার ছাড়া ইন্টারনেট ব্রাউজিং করা অসম্ভব। কিন্তু এত দামী ডেভেলপার দিয়ে তৈরি করা ব্রাউজার গুলো আমরা ফ্রিতেই ইউজ করতে পারি। আধুনিক এই যুগে এখন সব কিছু হাতের মুঠোয় হয়ে গেছে। চাইলে একসাথে ৫টি ব্রাউজার ও ইউজ করতে পারি আমরা। প্রতিনিয়ত সফটওয়্যার গুলো ডেভেলপ হচ্ছে এবং আগামী ১০ বছরে এর থেকে অচিন্তিত ফিচার আশা করা যায়।

Leave a Comment